রাজশাহীর বাঘায় ঋণের চাপ ও পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে বিষপান করে মরিয়ম (৩২) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের ফতেপুর উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
মরিয়ম ওই গ্রামের রুবেলের স্ত্রী। বিষপানের বিষয়টি টের পেয়ে প্রতিবেশীরা তাকে দ্রুত বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মরিয়ম একাধিক এনজিও থেকে মোট প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। পরিবারের দাবি, ওই টাকা তার ঘনিষ্ঠ দেবর আতাউরকে দেওয়া হয়েছিল।
আতাউর নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে দেবেন—এমন কথা থাকলেও কিছুদিন কিস্তি দেওয়ার পর তিনি আর টাকা দিতে পারবেন না বলে জানান। পরে আতাউর ও তার স্ত্রী গোপনে ঢাকায় চলে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর এনজিওগুলোর কিস্তি পরিশোধের দায়িত্ব মরিয়মের ওপর পড়ে। পরিবারের দাবি, কিস্তির টাকা পরিশোধে সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময় এনজিওকর্মীরা বাড়িতে এসে টাকা চাইতেন। এতে মরিয়ম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে বুধবার সকালে স্থানীয়ভাবে বিষ হিসেবে পরিচিত ‘ইনসিপিও’ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি।
মরিয়মের স্বামী রুবেল বলেন, “আমি ও আমার স্ত্রী বিশ্বাস করে আমার ভাই আতাউরকে একাধিক এনজিও থেকে ঋণ করে টাকা দিয়েছিলাম। কথা ছিল, সে নিয়মিত কিস্তির টাকা আমাদের পৌঁছে দেবে। কিছুদিন দেওয়ার পর সে আর টাকা দিতে পারবে না বলে বিভিন্ন কথা বলতে থাকে। একপর্যায়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। আমি একজন সাধারণ দিনমজুর। আমার পক্ষে এত টাকা ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন সময় এনজিওর লোকজন বাড়িতে এসে কিস্তির টাকা চান। এসব চাপ সহ্য করতে না পেরে আমার স্ত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।”
স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, ঋণের কিস্তি ও টাকা পরিশোধের বিষয় নিয়ে মরিয়মকে বেশ কিছুদিন ধরে দুশ্চিন্তায় থাকতে দেখা গেছে। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও পাওনাদারদের চাপ নিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলেও জানান তারা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মরিয়ম টিএমএসএস (ঠেংগামারা) শাখা থেকে ৮০ হাজার টাকা, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার টাকা, পাবনা প্রতিশ্রুতি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা, আভা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং ডাম ফাউন্ডেশন থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর শাখা ব্যবস্থাপকদের দাবি, মরিয়ম নিয়মিত কিস্তির টাকা পরিশোধ করছেন। ফলে তার ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ বা হয়রানির প্রশ্ন আসে না বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মরিয়মের স্বামীর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আলপনার কাছ থেকেও আতাউর বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়ে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছেন। আলপনা বলেন, “আমার স্বামী ও আমাকে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে প্রয়োজনের কথা বলে কিস্তির মাধ্যমে টাকা তুলে নেন আতাউর। কিন্তু তিনি আমাদের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।”
ঘটনার বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, বিষপানের পর ওই গৃহবধূকে হাসপাতালে আনা হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি মহিলা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আতাউরের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা ঋণের টাকা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ সেরাজুল হক বলেন, “এ সংক্রান্ত বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য