দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। অবশেষে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নন্দনগাছী রেলওয়ে স্টেশনের ১ নম্বর লুপ লাইনে থামল প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে লুপ লাইনের কারিগরি পরীক্ষা (ট্রায়াল রান) সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর দুপুর ১২টা ১ মিনিটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঈশ্বরদীগামী ৬ ডাউন মেইল ট্রেনটি ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করে। তিন মিনিট যাত্রাবিরতির পর ট্রেনটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামার দৃশ্য দেখতে দুপুরে স্টেশন এলাকায় ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা। ট্রেনটি লুপ লাইনে ঢুকে থামতেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন উপস্থিত মানুষ। যাত্রীদের অনেকেই সরাসরি প্ল্যাটফর্মে নেমে স্বস্তি প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ ওঠানামার অবসান হওয়ায় বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের মধ্যে দেখা যায় স্বস্তি।
এতদিন নন্দনগাছী স্টেশনের ১ নম্বর লাইন কার্যত অচল থাকায় ২ নম্বর লাইনে ট্রেন দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হতো। ফলে প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে ওঠা-নামার সময় যাত্রীদের ঝুঁকি নিতে হতো। অনেক সময় ট্রেনে উঠতে গিয়ে ঝুলে ঝুলে চলাচল করতে হতো। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ছিল। ১ নম্বর লুপ লাইন চালু হওয়ায় সেই দীর্ঘদিনের ভোগান্তির হাত থেকে দূর হয়েছে।
ঐতিহাসিক এই দিনে নন্দনগাছী স্টেশনে আসা লোকোমাস্টার, স্টেশন মাস্টারসহ রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থানীয়দের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। পরে তাঁদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে দেখতে পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তবে ১ নম্বর লাইন চালুর পরও স্টেশনটির যাত্রীসেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে আরও কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্টেশন মাস্টার। তিনি স্টেশনের বাথরুমে পানির ব্যবস্থা, মাস্টার রুমে তিনটি এক্সহস্ট ফ্যান ও তিনটি সিলিং ফ্যান স্থাপন, মূল স্টেশন ভবন সংস্কার, যাত্রীদের জন্য অপেক্ষাগার নির্মাণ এবং মাইক ও সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত নন্দনগাছী রেলওয়ে স্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী দুর্ভোগের প্রতীক। স্টেশনের ১ নম্বর লাইন দীর্ঘদিন কার্যত অচল থাকায় ২ নম্বর লাইনে ট্রেন দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হতো। প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে ট্রেন দাঁড়ানোয় নারী, শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে উঠতে-নামতে হতো।
এই দুর্ভোগের অবসান ও স্টেশন সংস্কারের দাবিতে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মানববন্ধন, অবরোধ, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
২০২৫ সালের ১ মে অনুষ্ঠিত বড় মানববন্ধনে বর্তমান রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাইদ চাঁদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পরে ১১ জুন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত স্টেশনে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। আবু সাঈদ চাঁদের অনুরোধে ওই অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। এর পর আন্দোলনের প্রথম সাফল্য হিসেবে ১৬ জুন থেকে ঈশ্বরদী-রহনপুর রুটের কমিউটার এক্সপ্রেস নন্দনগাছী স্টেশনে যাত্রাবিরতি শুরু করে।
এরপর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্টেশনটির সংস্কারকাজ হাতে নেয়। প্রায় দুই মাসের সংস্কারকাজ শেষে সোমবার সম্পন্ন হয় ১ নম্বর লুপ লাইনের ট্রায়াল। সফল ট্রায়ালের কয়েক ঘণ্টা পরই ৬ ডাউন মেইল ট্রেনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় নন্দনগাছী স্টেশনের ১ নম্বর লাইন।
দীর্ঘ আন্দোলন, দাবি ও অপেক্ষার পর এই লাইন চালুর মধ্য দিয়ে নন্দনগাছী রেলস্টেশনে ফিরল যাত্রীসেবার নতুন গতি।
মন্তব্য