বে-সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও নীতিমালার আলোকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারের কাছ থেকে মাসিক অনুদান পেয়ে থাকেন। তবে সময়ের ব্যবধানে পরিপত্র ও নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রে নানা শর্ত আরোপ করে আসছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’-এর একটি ধারা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন এমপিওভুক্ত হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী।
গত ৭ ডিসেম্বর জারি করা নীতিমালার ১১.১৭ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক পদে/চাকরিতে বা কোনো আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। তদন্তে বিষয়টি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই ধারার (খ) উপধারায় ‘আর্থিক লাভজনক পদ’ বলতে সরকার প্রদত্ত যেকোনো বেতন, ভাতা, সম্মানী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় কর্মের বিনিময়ে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা-সম্মানীকে বোঝানো হয়েছে।
এই বিধান কার্যকর হলে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে সারা দেশের শিক্ষক-সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নবগঠিত ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’-এর সূত্র জানায়, নীতিমালার এ ধারা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক সম্মেলনে উত্থাপিত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময় সভায় বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় নির্বাচনে প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তারা যদি প্রকাশ্যে সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন, তবে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে—এই যুক্তিতে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালাটি দেশজুড়ে শিক্ষকসমাজে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি অনেক শিক্ষক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তাদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের পর সৃজনশীল ও সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকা কোনো অপরাধ নয়।
নাটোরের শিক্ষক ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিক আব্দুস সালাম বলেন, “বেসরকারি শিক্ষকরা অনুদানের নামে যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। আর্থিক সংকটের কারণেই কর্মঘণ্টার পরে বিকল্প পেশায় যুক্ত হতে হয়। তবে এতে আমাদের মূল দায়িত্বে কোনো ঘাটতি থাকে না।”
শিক্ষক ও দৈনিক দেশ রূপান্তর-এর জেলা প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসকসহ অনেক পেশার মানুষ কর্মঘণ্টার বাইরে অন্য কাজ করেন—তাতে কোনো বাধা নেই। অথচ শিক্ষক-সাংবাদিকরা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তাদের কণ্ঠ রোধের চেষ্টা চলছে।”
নয়া দিগন্তের জেলা প্রতিনিধি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্র একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের ছুটির সময় কী করবো, তা নির্ধারণ করতে পারে না। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। অফিস সময়ে কঠোর দায়িত্ব চাইলে আপত্তি নেই, কিন্তু ব্যক্তিগত সময়ের ওপর হস্তক্ষেপ অযৌক্তিক।”
কুষ্টিয়ার শিক্ষক জাকিরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকরা সাংবাদিকতাকে অবৈধ আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। বরং শিক্ষিত ও নৈতিক অবস্থান থেকে সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকায় মফস্বলে চাঁদাবাজ ও হলুদ সাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য কমে।”
এদিকে ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংগঠনের আহ্বায়ক শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদ হাসান বাদল বলেন, “সাংবাদিকতা কোনো দ্বৈত পেশা নয়। ওয়েজ বোর্ড বাস্তবে কার্যকর না হওয়ায় অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিক নিয়মিত বেতন পান না। নীতিমালার এ ধারা সংবিধানের ২৬ ও ২৭ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।”
হাইকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজী রহমান মানিক বলেন, “এমপিও নীতিমালায় দ্বৈত পেশা বিষয়ে শর্ত আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল। ঢালাওভাবে সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করা সংবিধান ও মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, “নীতিমালার কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। এতে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।”
মন্তব্য