এক সময়ের জনপ্রিয় গানে ধ্বনিত হতো “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে, ধুতুর, ধুতুর, ধুতুর ধুর সানাই বাজিয়ে, যাব তোমায় শ্বশুর বাড়ি নিয়ে” গ্রামীণ জনপদের চলাচল ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই গরুর গাড়ি। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার বিবর্তনে যন্ত্রচালিত যানের প্রভাবে আজ এটি রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে।
মৎস্য ও শস্য ভান্ডার খ্যাত নওগাঁর আত্রাইয়ে এক সময় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ি। নতুন প্রযুক্তির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটলেও তা হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের এই অনন্য ঐতিহ্য। গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন। জানা যায়, রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময় বা বিপদে পড়লে গরুর গাড়িগুলোকে গোল করে সাজিয়ে এক ধরনের দুর্গ গড়ে তোলা হতো।
গরুর গাড়ি ছিল দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা বিশেষ যান। সাধারণত চালক বসতেন গাড়ির সামনের দিকে, আর পেছনে যাত্রী ও মালপত্র বহন করা হতো। কৃষিজাত দ্রব্য ও ফসল পরিবহনে এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। একসময় উত্তরাঞ্চলের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে কৃষি ফসল ও মানুষ বহনের জনপ্রিয় বাহন ছিল এটি।
দমদমা গ্রামের মো. আব্দুল মালেক মোল্লা বলেন, দুই যুগ আগে গরুর গাড়িতে চড়ে নতুন বর-বধূ যেত। গরুর গাড়ি ছাড়া বিয়ে হতো না। বরপক্ষের লোকজন ১০ থেকে ১২টি গরুর গাড়ির ছাওনি সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ি যেত। রাস্তায় গরুর গাড়ি থেকে পটকা ফুটাত।
যে পরিবারে গরুর গাড়ি ছিল, তাদের কদর ছিল অনেক। কৃষকরা ফজরের আগেই গরুর গাড়িতে করে জৈব সার, লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যেত। গাইত ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ এর মতো ভাওয়াইয়া গান।
চালককে উদ্দেশ্য করে রচিত হয়েছে ‘আস্তে বোলাও গাড়ি, আরেক নজর দেখিয়া ন্যাং মুই দয়ার বাপের বাড়িরে গাড়িয়াল’ এর মতো জনপ্রিয় গান। কিন্তু বর্তমানে মোটরযানের কারণে ধীর গতির এই যানের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। আগে গ্রামাঞ্চলে পাকা রাস্তা না থাকায় যান্ত্রিক যান চলত না, তাই গরুর গাড়িই ছিল ভরসা।
গরুর গাড়ির বড় সুবিধা হলো-এতে জ্বালানি লাগে না, ধোঁয়া হয় না, পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। এটি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশবান্ধব। আবার ধীর গতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কম। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে এই ঐতিহ্যবাহী বাহন আজ বিলুপ্তির পথে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বইতে পড়ে জানতে হবে, এক সময় মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ি। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রকৃতিবান্ধব গরুর গাড়ি নানা কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও দু-একটি দেখা গেলেও এখন তা ডুমুরের ফুল।
সাংবাদিক মোঃ আব্দুস ছালাম
উপজেলা প্রতিনিধি, আত্রাই, নওগাঁ।
০১৭২০,৯৬৯৭৭২
মন্তব্য