দিন-রাতের যেকোনো সময় মৃত্যুর সংবাদ পেলেই ছুটে যান তারা। মরদেহের মাপ নিয়ে শুরু করেন কবর খোঁড়ার কাজ। অথচ এর বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। প্রায় ৪৫ বছর ধরে এভাবেই বিনা টাকায় মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে আসছেন তারা। এ পর্যন্ত তারা ৩৫০টিরও বেশি কবর খুঁড়েছেন।
বলছি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের চকবাউসা গ্রামের মো. দুলাল আলী (৬৫) ও মো. রতন আলী (৪২)-এর কথা। পেশায় কেউ কৃষি, কেউ ব্যবসা করে সংসার চালান। তবে কবর খোঁড়ার জন্য কখনোই অর্থ নেন না তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঘা উপজেলার আড়ানী, বাউসা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মরদেহের কবর খোঁড়ার দায়িত্ব নেন তারা। এ কাজে সহযোগিতা করেন চকবাউসার সাবুর ছেলে রতন, মনিরুল ইসলামসহ আরও অনেকে।
রতন আলী জানান, বাবার মৃত্যুর পর থেকেই তিনি কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত হন। তখন বয়স ছিল ১৯-২০ বছর। এরপর থেকে টানা ৪৫ বছরে প্রায় ৩০০-৩৫০টি কবর খুঁড়েছেন। তিনি বলেন,
“বাবার স্মৃতি ধরে রাখতেই এ কাজ করি। করোনাকালে যখন সবাই ভয় পেয়ে মরদেহের কাছে যেত না, তখনো আমরা দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো লোভ নেই, হাদিয়া বা টাকাও নেই না। এমনকি দাফনের পর কোনো অনুষ্ঠানে খেতেও যাই না। এটা আমার নেশায় পরিণত হয়েছে। আল্লাহর কাছে চাই, আখিরাতে যেন এর প্রতিদান পাই।”
অন্যদিকে দুলাল হোসেন বলেন,
“আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে কবর তৈরি করে আসছি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা গভীর রাতেও গোরস্থানে গিয়েছি। অনেক সময় পুরনো কঙ্কালও পেয়েছি, সেগুলো যথাযথভাবে আবার কবরে রেখে দিয়েছি। কখনো ভয় পাইনি, মনে হয় আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেন।”
তিনি আরও যোগ করেন,
“রাত দুইটা-তিনটায়ও যদি কেউ খবর দেয়, আমরা খুন্তা, কোদাল, বেলচা, দা, করাত নিয়ে হাজির হই। মরদেহের মাপ নিয়ে কবর তৈরির কাজ শুরু করি। এখন পর্যন্ত ৩৫০টির বেশি কবর করেছি, তবে কখনো কোনো পারিশ্রমিক নিইনি।”
এলাকাবাসীর ভাষায়, তারা দুজন সাধারণ কৃষক-শ্রমিক হলেও মৃত্যুসংবাদ পেলেই ছুটে যান মরদেহের বাড়িতে। বিনিময়ে কোনো অর্থ চান না। সমাজে এ ধরনের পরোপকারী মানুষ খুব কমই আছে।
পরিশেষে দুলাল ও রতন সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন—যতদিন বেঁচে থাকেন সুস্থ থাকেন, আর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত যেন মানুষকে কবর খুঁড়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
মন্তব্য