রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের এক চা বিক্রেতার মেয়ে মাহমুদা খাতুন। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি এবার জামালপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে অর্থাভাবে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা গ্রামের একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার পরিচালনা করেন। প্রতিদিন তার আয় হয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে পরিবারের খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। তারপরও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কখনো পিছপা হননি তিনি।
মাহমুদা শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৩ সালে কৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ২০২৫ সালে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জামালপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।
মাসুদ রানা বলেন, “আমরা লেখাপড়া জানি না। কিন্তু মেয়েটার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। অনেক সময় নিজেরা না খেয়ে থেকেছি, তবুও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দিইনি। প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্যও ছিল না। নিজের চেষ্টায় সে আজ মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে।”
তিনি জানান, মেডিকেলে ভর্তি হতে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, যা ধার করে জোগাড় করতে হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় বই কিনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং কলেজের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি স্কেলিটন (কঙ্কাল মডেল) কিনতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা প্রয়োজন। এছাড়া প্রতি মাসে হোস্টেল, খাওয়া-দাওয়া ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হবে।
মাহমুদার মা সায়েরা বিবি বলেন, “আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই। মাত্র দুই শতক জমির ওপর মাটির ঘরে বসবাস করি। মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে ডাক্তার হয়ে গরিব মানুষের সেবা করবে। অর্থের অভাবে যদি তার স্বপ্ন ভেঙে যায়, তাহলে সেটা শুধু আমাদের পরিবারের নয়, সমাজেরও ক্ষতি হবে।”
বর্তমানে জামালপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে হোস্টেলে উঠলেও প্রয়োজনীয় অনেক বইপত্র এখনও সংগ্রহ করতে পারেননি মাহমুদা।
তিনি বলেন, “অনেক বই এখনও কিনতে পারিনি। অন্যের বই দেখে পড়তে হচ্ছে। কলেজ থেকে স্কেলিটন কিনতে বলা হয়েছে, কিন্তু বাবার পক্ষে সেটি কেনা সম্ভব নয়। আমি শুধু চাই, আমার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও মুন্ডুমালা পৌরসভার কর্মচারী হেলাল উদ্দিন বলেন, “অভাবের মধ্যেও মাহমুদা কখনও হাল ছাড়েনি। অন্যের বই ধার করে পড়াশোনা করেছে। একজন চা বিক্রেতার মেয়ে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে—এটি পুরো এলাকার গর্ব। সমাজের বিত্তবানদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।”
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, “মাহমুদার মেডিকেলে ভর্তির বিষয়টি আগে জানতাম না। এমন একটি পরিবার থেকে মেডিকেলে ভর্তি হওয়া পুরো তানোর উপজেলার জন্য গর্বের বিষয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে কিছু আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।”
অভাবের দেয়াল পেরিয়ে মাহমুদা আজ মেডিকেল কলেজের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছেছেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণের পথ এখনও দীর্ঘ। সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থসংকট। এখন প্রশ্ন—মাহমুদার মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন কি অর্থের অভাবে থেমে যাবে, নাকি সমাজের সহমর্মিতা ও মানবিকতা তাকে পৌঁছে দেবে সাদা অ্যাপ্রনের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে?
সহায়তার জন্য যোগাযোগ:
মাহমুদার বাবা মাসুদ রানা – ০১৭৯৬-৮৮১৪৪৯।
মন্তব্য