নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়েরের পরদিনই নাটোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার এবং লালপুরের ইউএনও মো. বরকত উল্লাহকে বদলি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ আদেশ দেওয়া হয়। আকস্মিক এই প্রশাসনিক রদবদলকে ঘিরে নাটোরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নাটোরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। অপর এক আদেশে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ১২ আগস্ট ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের জেরে লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় সোমবার (১৭ আগস্ট) লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শুকুর আলী বাদী হয়ে নিজ নিজ থানায় পৃথক দুটি এজাহার দায়ের করেন।
এজাহারে মোট ২৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
লালপুরে ১৮ বিএনপি নেতার নাম
লালপুর থানায় দায়ের করা এজাহারে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজ রঞ্জু, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. হারুন অর রশিদ পাপ্পু, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. জিল্লুর রহমান জুলহাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।
এজাহারে উপজেলা ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাগাতিপাড়ায় সাতজনের নাম
অন্যদিকে বাগাতিপাড়া থানায় দায়ের করা এজাহারে উপজেলা ছাত্রদল ও যুবদলের সাত নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সাব্বির হোসেন মুন্না।
এ মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বদলি নিয়ে নানা প্রশ্ন
এজাহার দায়েরের পরদিনই জেলা প্রশাসক ও লালপুর ইউএনওকে বদলি করায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
তবে কর্মকর্তাদের বদলির সঙ্গে মামলার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়নি। প্রশাসনিক সূত্র থেকেও এ বিষয়ে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
বিএনপির দাবি, ‘ষড়যন্ত্র’
নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ থাকলে মামলা করতে বিএনপির কোনো আপত্তি নেই। তবে ঢালাওভাবে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, দলকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে নেতাকর্মীদের মামলায় জড়ানো হয়েছে। সরকারি কার্যালয়ে হামলা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্টের ঘটনায় প্রকৃত জড়িতদের তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার আহ্বান জানান।
সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নাটোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার কারণেই ইউএনও ও ডিসিকে বদলি করা হয়েছে। এমনটি হয়ে থাকলে তা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাটোর জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ শিশিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, একই ঘটনায় সরকারি কার্যালয়ে সিসিটিভির ফুটেজ দেখে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগের সত্যতা এবং কারা প্রকৃতভাবে জড়িত ছিলেন—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মন্তব্য