রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিবেদক
২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রায়গঞ্জে ৩০ বছরের জলাবদ্ধতার অবসান, চাষে ফিরছে ৫ হাজার বিঘা জমি

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধতায় পড়ে থাকা প্রায় ৫ হাজার বিঘা ফসলি জমি আবারও চাষাবাদের আওতায় আসার পথ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ, অর্থ ও শ্রম এবং উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত উঠান বৈঠকে দিক নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষিত কারিগরি সহযোগিতায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ব্যবস্থাপনায় স্থাপন করা হয়েছে পানি নিষ্কাশনের পাইপলাইন। এতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি কৃষকদের হারানো আবাদি জমি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে ঘুড়কা ইউনিয়নের জগন্নাথপুর ও ঘুড়কা নতুনপাড়া এলাকায় স্থাপিত পানি নিষ্কাশন পাইপলাইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী।
উপজেলা প্রশাসনের কারিগরি সহযোগিতায় ভুক্তভোগী কৃষকদের সঞ্চিত প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি নিষ্কাশনের পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের পাশাপাশি স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রম দিয়েও সহযোগিতা করেন।
জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক মৃত মজনু সরকারের স্ত্রী মোছা. সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমাদের মাত্র এক বিঘা ফসলি জমি। সেটিও বছরের পর বছর পানির নিচে পড়ে থাকায় কোনো ফসল হয় না। অন্য কোনো আবাদি জমিও নেই। নিজের জমি থাকা সত্ত্বেও বিধবা হয়ে তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করি, আর বাবার বাড়ি থেকে পাঠানো সাহায্যে চলি। এখন জমিতে ফসল ফলাতে পারব—এটাই আমাদের জন্য বড় আশার বিষয়।’
৩০ বছরে সম্ভাব্য ক্ষতি ৪৪২ কোটি ৫০ লাখ টাকাঃ
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোমিনুল ইসলামের হিসাব অনুযায়ী, জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন থেকে কৃষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন। প্রতি বিঘায় গড়ে ৪ মণ সরিষা উৎপাদন হলে এবং প্রতি মণের দাম গড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা ধরলে ৫ হাজার বিঘা জমিতে সরিষার বার্ষিক উৎপাদনমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি টাকা। ৩০ বছরে এর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, প্রতি বিঘায় গড়ে ১৫ মণ ধান উৎপাদন এবং প্রতি মণ ধানের গড় মূল্য ১ হাজার ৩০০ টাকা ধরলে ৫ হাজার বিঘা জমিতে বার্ষিক উৎপাদনমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ৩০ বছরে এর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

তবে একই জমিতে প্রতিবছর একাধিক ফসল এবং উৎপাদন ও বাজারদরের ওঠানামা বিবেচনায় না এনে শুধু সরিষা ও ধানের হিসাবে সম্ভাব্য উৎপাদনমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৩০ বছরে এসব জমিতে ফসল উৎপাদন না হওয়ায় সম্ভাব্য অনুৎপাদনজনিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৪২ কোটি টাকা। স্থানীয় কৃষকদের মতে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
কৃষকের মুখে নতুন আশার কথা
ঘুড়কা নতুনপাড়া এলাকার কৃষক তমেজ আলী ও রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জমিগুলো দীর্ঘদিন ধরে পানিতে পড়ে থাকায় চাষাবাদ করতে পারিনি। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায় এখন আবার জমিগুলো কাজে লাগানো যাবে। এতে উৎপাদন বাড়বে, পরিবারের আয়ও বাড়বে।’
জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক আব্দুল মমিন, আমির হোসেন ও মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এত বছর পর জমিতে চাষাবাদের সুযোগ তৈরি হয়েছে, এটা আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজটি হয়েছে। এখন পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং পাইপলাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা স্থায়ীভাবে উপকৃত হবেন।’
প্রশাসন ও বিএডিসির আশ্বাসঃ
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার স্থানীয় ভুক্তভোগীদের নিয়ে উঠান বৈঠক ও মাঠ পর্যায়ে নানা প্রকার পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ফলে বিপুল পরিমাণ জমি চাষের আওতায় আসবে। এতে কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হবে।’
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ক্ষুদ্র সেচ বিভাগের প্রকৌশলী আনন্দ বর্মন বলেন, ‘পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কারিগরি দিক ঠিক রেখে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। সঠিকভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের কাজে আসবে।’
পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে জমিগুলোতে আবার ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের আশা, পাইপলাইন ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে অনাবাদি পড়ে থাকা জমি ধীরে ধীরে উৎপাদনে ফিরবে, বাড়বে কৃষকের আয় এবং এলাকার সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।
পাইপলাইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রায়গঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসাইন শেখ, ঘুড়কা ইউনিয়ন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাবা নন, তবুও ২৪ বছরে ১১২ মেয়ের বিয়ে দিলেন রুবেল

বাগাতিপাড়ায় একদিনের প্রাইজমানি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত

নাটোরে বাসচাপায় নিহত – ২

বাঘায় ওয়ারেন্ট ভূক্ত আসামী,আয়াসহ শিক্ষক আটক 

রায়গঞ্জে ৩০ বছরের জলাবদ্ধতার অবসান, চাষে ফিরছে ৫ হাজার বিঘা জমি

বাঘায় জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীর দোয়া মাহফিল ও এমপি চাঁদকে সংবর্ধনা প্রদান

বিএনপির কর্মকাণ্ড ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই-জমায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম খান এমপি

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার মতবিনিময় সভা

আত্রাইয়ে মুক্তিযোদ্ধা মাছিম উদ্দিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

সান্তাহারে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

১০

নলডাঙ্গায় বসতবাড়ি থেকে সৎ মাকে উচ্ছেদ চেষ্টার অভিযোগ

১১

বড়াইগ্রামে পুকুরের পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

১২

বাগাতিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

১৩

অপহরণের অভিযোগে ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন

১৪

আদমদীঘিতে নাশকতা হামলা মামলায় নিসিদ্ধ আ’লীগ নেতা গ্রেপ্তার

১৫

আদমদীঘিতে ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ

১৬

এক বিদ্যালয়ে দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, দ্বন্দ্বে ব্যাহত পাঠদান

১৭

নাটোরের ডিসি ও দুই ইউএনও প্রত্যাহার-বদলি

১৮

বাগাতিপাড়ার ইউএনও দেবাশীষ বসাককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি

১৯

শেষ ফোনকলে কালেমা, এরপর মসজিদে মিলল ঝুলন্ত মরদেহ

২০