নাটোরের বাগাতিপাড়ার সোনাপাতিল মহল্লার এক সাধারণ নারী মোছাঃ আছিয়া বেগম। বয়স ৬০ বছর হলেও জীবনের নানা সংগ্রাম পেরিয়ে আজ তিনি পরিচিত হয়েছেন একজন অদম্য নারী হিসেবে। “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” কার্যক্রমে উপজেলা, জেলা পেরিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে “সফল জননী” ক্যাটাগরীতে নির্বাচিত হয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন তিনি।
জীবনের শুরু ও সংগ্রাম
১৯৮০ সালে বাগাতিপাড়ায় বধূ হয়ে আসেন আছিয়া বেগম। স্বামী খলিলুর রহমান ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। সংসারে তিন মেয়ে ও দুই ছেলেসহ মোট পাঁচ সন্তানের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু ২০০৭ সালের ৯ মার্চ হঠাৎই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে স্বামী মারা যান। হঠাৎ স্বামীর মৃত্যুতে তিন বিঘা জমি, সামান্য ভাড়া দোকান আর ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর নির্ভর করে সংসার চালানো হয়ে পড়ে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
তখনও সন্তানরা সবাই পড়াশোনারত— কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের লেখাপড়া, খাওয়া-পরার খরচ— সবই ভর করল আছিয়া বেগমের কাঁধে। কিন্তু তিনি হার মানেননি। সন্তানদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি লড়াই করেছেন অবিরাম। সন্তানরাও টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরি করে মায়ের সংগ্রামে পাশে থেকেছে।
সন্তানদের সাফল্যে জননীর জয়
মায়ের সেই অদম্য সংগ্রামের ফল আজ সমাজের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বর্তমানে আছিয়া বেগমের পাঁচ সন্তানই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত।
বড় মেয়ে খালেদা পারভীন (পপি) প্রভাষক, বাগাতিপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ; জামাই মো: আলমগীর কবির একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত।
মেজ মেয়ে পাপিয়া সুলতানা (টপি) পরিবেশ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক; জামাই ড. আবদুল বারি জামালী বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক।
ছোট মেয়ে সুমাইয়া শারমিন কৃষিতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষে বিসিএস প্রস্তুতিমূলক অধ্যয়নরত; জামাই খায়রুল ইসলাম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত।
বড় ছেলে প্রভাষক আরিফুল ইসলাম তপু, (সাংবাদিক ও কলামিস্ট) প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক এই নাটোর। সাংবাদিক-কলামিস্ট; স্ত্রী লুৎফুননাহার লিটা (এমএসএস- রা.বি) একজন শিক্ষিত মানবাধিকারকর্মী।
ছোট ছেলে আশরাফুল ইসলাম (অপু) ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার; তার স্ত্রী সুফিয়া আক্তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
সব সন্তান-সন্তানবধূ উচ্চশিক্ষিত ও সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠিত। এটাই আছিয়া বেগমের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
জয়িতার স্বীকৃতি
স্বামীর মৃত্যুর পর দুঃখ-দুর্দশাকে জয় করে সন্তানদের মানুষ করার অদম্য প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ আছিয়া বেগমকে প্রথমে বাগাতিপাড়া পৌরসভায়, পরে উপজেলা পর্যায়ে ইউ.এন.ও হা-মীম তাবাসসুম প্রভা’র নিকট থেকে , তারপর জেলা পর্যায়ে ডি.সি আসমা শাহিন এঁর নিকট থেকে “সফল জননী” হিসেবে নির্বাচিত হয়ে পুরস্কার (নগদ অর্থ, সনদপত্র ও ক্রেস্ট) গ্রহণ করেন। সর্বশেষ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি অদম্য নারী হিসেবে সম্মাননা গ্রহণ করেন।
(১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সফল জননী ক্যাটাগরিতে তাকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সহযোগিতায় নারীবিষয়ক কর্মকর্তা কার্যালয়ের উদ্যোগে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (গ্রেড-১) কেয়া খান সফল জননী আছিয়া বেগমের হাতে পুরস্কার (নগদ অর্থ,ক্রেস্ট ও সনদপত্র) তুলে দেন।এসময় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার খোন্দকার আজিম আহমেদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী রেঞ্জের উপ-পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান, পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনির হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) তরফদার মো. আক্তার জামীল।
অনুপ্রেরণার প্রতীক
আছিয়া বেগমের গল্প শুধুমাত্র একজন মায়ের জীবনী নয়, এটি এক নারীর দৃঢ়তা, সংগ্রাম আর স্বপ্নপূরণের ইতিহাস। তিনি প্রমাণ করেছেন— অর্থ-সম্পদ নয়, শিক্ষিত ও সুসন্তান গড়ে তোলাই একজন জননীর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আজ আছিয়া বেগম শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের কাছে এক অনুকরণীয় উদাহরণ— অদম্য ও সফল জননী, জয়িতা নারী।
মন্তব্য