আছিয়া বেগম — নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার সোনাপাতিল মহল্লার একজন সাধারণ গৃহিণী, কিন্তু তাঁর জীবনযাত্রা ছিল এক অসাধারণ সংগ্রামের অনন্য উদাহরণ। জীবন যুদ্ধে বারবার হেরে না গিয়ে, সময়ের কঠিন পরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন ‘জয়িতা’— একজন সফল জননী, একজন সাহসিনী ও অদম্য নারী।
২০০৭ সালের ৯ মার্চ আকস্মিকভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বামী খলিলুর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁদের পাঁচ সন্তানের কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। পরিবারে ছিল মাত্র সামান্য জমি, দোকান এবং স্বামীর ব্যবসার কিছু অবশিষ্ট।এমতাবস্থায় সংসারে হঠাৎ নেমে আসা সেই বিপর্যয় মুহূর্তেই যেন স্তব্ধ করে দেয় চারপাশ। তবে আছিয়া বেগম সেদিন ভেঙে পড়েননি। বরং বুক চিপিয়ে দাঁড়িয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার ভার একাই কাঁধে তুলে নেন।
তিনি ছিলেন না কোনো চাকরিজীবী, ছিল না তাঁর ব্যাংক-ব্যালেন্স কিংবা দানশীল কারও সহায়তা। ছিল কেবল অদম্য মনোবল, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং সন্তানদের মানুষ করে গড়ার এক অটল সংকল্প। দিনের পর দিন নিজে কষ্ট সহ্য করে, রাত জেগে সন্তানদের দেখাশোনা করে, কখনো নিজের মুখে খাবার না তুলে দিয়ে সন্তানদের পাতে দিয়েছেন ভালোবাসার অংশ। সন্তানরা টিউশনি, খণ্ডকালীন কাজের মাধ্যমে সহায়তা করলেও মূল দায়ভার ছিল একাই এই মায়ের উপর।
আজ সেই মায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ পাঁচ সন্তান,জামাই,পুত্রবধূ সবাই প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত ।
বড় মেয়ে খালেদা পারভীন (পপি) প্রভাষক, বাগাতিপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ; জামাই মো: আলমগীর কবির একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত।
মেজ মেয়ে পাপিয়া সুলতানা (টপি) পরিবেশ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক; জামাই ড. আবদুল বারি জামালী বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক।
ছোট মেয়ে সুমাইয়া শারমিন কৃষিতে অনার্স ও মাস্টার্স শেষে বিসিএস প্রস্তুতিমূলক অধ্যয়নরত; জামাই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত।
বড় ছেলে প্রভাষক আরিফুল ইসলাম তপু, (সাংবাদিক ও কলামিস্ট) প্রকাশক ও সম্পাদক, দৈনিক এই নাটোর। স্ত্রী লুৎফুননাহার লিটা (এমএসএস- রা বি)একজন শিক্ষিত মানবাধিকারকর্মী।
ছোট ছেলে আশরাফুল ইসলাম (অপু) ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার; তার স্ত্রী সুফিয়া আক্তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
এই সকল অর্জনের মূলে রয়েছেন একজন জননী—আছিয়া বেগম।
এই মায়ের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি এসেছে জাতীয় পর্যায় থেকেও। “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” কর্মসূচির আওতায় তিনি পৌরসভা,উপজেলা, জেলা ও সর্বশেষ রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে ‘সফল জননী’ ক্যাটাগরিতে সম্মানিত হন। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কেয়া খান তাঁর হাতে সম্মাননা তুলে দেন।
এই সম্মাননা ছিল না কোনো বিলাসিতা কিংবা সৌভাগ্যের ফসল। এটি ছিল একজন জননীর আত্মত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম, ভালোবাসা ও অটুট মনোবলের স্বীকৃতি। যখন তাঁর হাতে ক্রেস্ট, সনদ ও উত্তরীয় তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন যেন পুরো সমাজ তাঁর এই অর্জনের গর্ব ভাগ করে নিচ্ছিল।
আছিয়া বেগম আজ শুধুমাত্র একজন মা নন, তিনি সমাজের সকল নারীর জন্য একটি অনুপ্রেরণা। অর্থ-সম্পদ না থাকলেও একজন মা যদি তাঁর সন্তানদের সুশিক্ষিত, নৈতিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তবে সেটিই সমাজ গঠনের সবচেয়ে বড় অবদান। আছিয়া বেগম ঠিক তাই করেছেন।
আজও সমাজে অসংখ্য নারী আছেন, যারা নিঃশব্দে সংগ্রাম করে চলেছেন। আছিয়া বেগমের গল্প তাঁদের সাহস জোগাবে, প্রেরণা দেবে। কারণ একজন ‘জয়িতা’ কেবল পুরস্কার পাওয়া একজন নারী নন, তিনি আমাদের সমাজের প্রতিটি সংগ্রামী নারীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
এই পৃথিবীতে যদি কোনো পরিচয় সবচেয়ে গর্বের হয়, তবে তা হলো— কেউ একজন ‘আছিয়া বেগমের সন্তান’।
জয় হোক সকল মায়ের। জয় হোক সেই অদম্য সাহসের, যার নাম ‘মা’।
✍️ প্রভাষক এম. আরিফুল ইসলাম তপু (প্রগতিশীল সমাজ চিন্তক, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
মন্তব্য