নাটোরের লালপুরে একটি বিতর্কিত খাল পুনঃখনন প্রকল্প ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ।
জানা গেছে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের নিজস্ব কৃষি খামারের জমিতে প্রায় ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘খাল পুনঃখনন’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কিন্তু কাগজ-কলম ঘেঁটে দেখা গেছে—যেখানে খাল খননের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে অতীতে কোনো খালের অস্তিত্বই ছিল না।
বিএডিসির দাবি, পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধার জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, মূলত সরকারি অর্থ লুটপাটের উদ্দেশ্যেই এই মিথ্যা ‘পুনঃখনন’ দেখিয়ে প্রকল্প চালানো হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নরেন্দ্রপুর কৃষি খামারের জমিতে যেখানে খাল পুনর্খননের দাবি করা হচ্ছে, সেখানে আসলে নতুন করে মাটি কেটে ‘খালসদৃশ’ কিছু তৈরি করা হয়েছে। সিএস ও আরএস রেকর্ড বলছে—এই জমিতে কখনোই কোনো প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম খাল ছিল না।
তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘ভূপৃষ্ঠের পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় মোট ৮.৭৬ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। যার পুরো ব্যয়—৬২ লাখ ২০ হাজার ৯০৮ টাকা।
নদী ও পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনগুলো বলছে, লালপুর ও আশপাশের এলাকায় বহু খাল রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় মরে গেছে। সেইসব খাল পুনরুজ্জীবিত করলে কৃষকরা উপকৃত হতেন। বরং সেগুলো বাদ দিয়ে সুগার মিলের জমিতে খাল খনন প্রশ্ন তুলেছে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রফেসর আনোয়ার সাদত বলেন, “পুনর্খননের নামে সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে। প্রকৃত খালগুলো বাঁচানো হলে পানি সঞ্চয়, মাছ চাষ এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ত। কিন্তু তা হয়নি।”
‘পানি নিষ্কাশনের জন্য’ দাবি করলেও, মাছ চাষে লিজ
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া জানান, মিলের জমিতে পানি নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য খাল খনন করা হয়েছে। বর্তমানে সেই খাল মাছ ও সবজি চাষের জন্য লিজে দেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এসব খাল জনসাধারণের কোনো কাজে আসছে না। বরং মিল কর্তৃপক্ষ ও বিএডিসির যোগসাজশে কোটি টাকার সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কৃষক সৈয়দ আলী বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম মিল কর্তৃপক্ষ তাদের জমিতে ড্রেন করছে। পরে জানতে পারি, এটা ‘পুনর্খনন’ প্রকল্প! অথচ এখানে আগে কোনো খালই ছিল না।”
বিএডিসির বড়াইগ্রাম অফিসের সহকারী প্রকৌশলী জিয়াউল হক বলেন, “মিল কর্তৃপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জমির পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থেই খনন করা হয়েছে।” তবে মরা খাল ফেলে নতুন খাল খননের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দিতে চাননি।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন, “যেখানে খালই ছিল না, সেখানে পুনর্খনন প্রকল্প চালানো স্পষ্টতই অনিয়ম। এর পেছনে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
মন্তব্য