রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন দালাল ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কবলে। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা ভোগছেন চরম হয়রানিতে। হাসপাতালের ভেতরেই চলছে দালালদের দৌরাত্ম্য—প্রেসক্রিপশন কেড়ে নিয়ে রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টানাটানি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী নিয়মিত দালালি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। তারা সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিয়ে শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন পান। অভিযোগে উঠে এসেছে সেবিকা বিথি, বাদশাহ বাবু, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট তানজিলা, নাইটগার্ড মুন, আয়া বেদেনা বেগম ও জরিনা বেগম, টিকিট কাউন্টারের জাহাঙ্গীর এবং পরিবার পরিকল্পনা স্টোরকিপার বাবলু মাস্টারের নাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহে তিনদিন বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্রবেশের নির্ধারিত সময় থাকলেও নিয়মটি মানা হচ্ছে না। দিনভর হাসপাতালের করিডোরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি ও ক্লিনিকের দালালরা।
স্থানীয়রা জানান, ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন কার্যত দালালদের নিয়ন্ত্রণে। রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে বিপাকে পড়ছেন, অনেকেই দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। একাধিক রোগী অভিযোগ করেছেন, প্রেসক্রিপশন হাতে পাওয়া মাত্রই দালালরা সেটি কেড়ে নিয়ে নিজেদের পছন্দের ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করেন।
কিছুদিন আগে হাসপাতাল চত্বরে “দালালমুক্ত পুঠিয়া মেডিকেল চাই” শ্লোগানে প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন স্থানীয় কয়েকজন যুবক। নেতৃত্ব দেন শামীম ড্রাইভার নামে এক তরুণ। কিন্তু ওইদিন দালালদের হামলায় আহত হন তিনি। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবুও বন্ধ হয়নি দালালি।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের সামনে প্রায় দেড় ডজন প্যাথলজি সেন্টার ও ১০টি অবৈধ ক্লিনিক রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই দালাল রয়েছে, যারা রোগী ধরতে ব্যস্ত থাকে। প্রতি মাসে এসব ক্লিনিক থেকে ডাক্তারদের কমিশন দেওয়া হয়—মাসে কেউ কেউ ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত পান।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ২৩টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১৩টি ক্লিনিক আছে। অধিকাংশই দালাল নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। তাদের মাসিক বেতন ৬-৭ হাজার টাকা, পাশাপাশি পরীক্ষার বিলের ৪০ শতাংশ কমিশন দেওয়া হয়।
জরুরি বিভাগের এক উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার বলেন, “দালালদের কারণে অনেক সময় রোগীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে আমরা কিছু বলতে পারি না।”
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোহাম্মদ জনাব আলী বলেন, “আমাদের উপস্থিতি টের পেলেই দালালরা পালিয়ে যায়, পরে আবার ফিরে আসে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সূচনা মনোহরা বলেন, “আমি এখানে নতুন। তবে দালালদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দ্রুত পুঠিয়া হাসপাতাল দালালমুক্ত করব। যদি সরকারি স্টাফ কেউ জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান বলেন, “দালালদের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে দ্রুত তদন্ত করে দালালদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালালদের এমন দৌরাত্ম্যে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মন্তব্য