নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়নে দীর্ঘদিন ধরে যে নিষ্ঠা, সাহস এবং অবিচল মনোবল নিয়ে কাজ করে আসছেন—আলো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামীমা লাইজু নীলা, তার স্বীকৃতি মিললো একই সাথে নাটোর সদর উপজেলা ও নাটোর জেলা পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে দেওয়া হয় ‘অদম্য নারী পুরস্কার–২০২৫’।
গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো: আবুল হায়াত, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নীলা হাফিয়া, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, নারী উদ্যোক্তা ও উন্নয়নকর্মীরা।
সরল কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ এই আয়োজনে নারীর সামাজিক নেতৃত্ব, প্রতিরোধ ও অগ্রগতি—সবকিছুরই এক অনন্য সমন্বয় ফুটে ওঠে।
নারী অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নে নীলার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে নাটোর অঞ্চলে শামীমা লাইজু নীলা এক পরিচিত নাম। বহু বছর ধরে তিনি কাজ করে আসছেন—নারীর অধিকার রক্ষা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, বাল্যবিবাহ রোধ, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম, গ্রামীণ নারীদের সংগঠিত করা ও উদ্যোক্তা তৈরি, আইনগত সহযোগিতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি সহ নানাবিধ কর্মকাণ্ড। তার নেতৃত্বে ‘আলো’ সংস্থা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। নিপীড়নের শিকার এবং ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জীবনে আলো ফিরিয়ে আনা—তার কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সমাজের মৌলিক কাঠামোতে নারীর অবস্থানকে এগিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নীলা দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। ফলেই তিনি আজ নারীর অগ্রযাত্রার এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন নাটোরে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন যখন নীলার হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন, তখন উপস্থিত সবাই হাততালিতে অভিবাদন জানান এই দৃঢ়চেতা নারীকে।
সম্মান গ্রহণের পর নীলা বলেন—
“এই সম্মান আমার কাজের দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিল। নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য রোধে বহু বছর ধরে যে পথ চলছি, এই পুরস্কার সেই পথচলাকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে অনুপ্রাণিত করবে।”
তার এই বক্তব্যে উঁকি দেয় আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও সমাজ পরিবর্তনের প্রগাঢ় অঙ্গীকার।
অনুষ্ঠানে বক্তারা নীলার অবদানকে নারীর প্রতিরোধ, নেতৃত্ব এবং অগ্রগতির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রত্যাশা নারী কল্যাণ সংস্থার সভাপতি লাভলী ইয়াসমিন বলেন—
“শামীমা লাইজু নীলা শুধু জেলা নয়, বিভাগীয় পর্যায়ে সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য একজন মানুষ। তার কাজ নীরব, কিন্তু প্রভাব গভীর।”
শাপলা পারভীন, একজন স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা, বলেন—
“নীলার এই অর্জন আমাদের মতো নতুন উদ্যোক্তাদেরও অনুপ্রাণিত করবে। সমাজে পরিবর্তন আনতে যে সাহস ও নিবেদন প্রয়োজন, তার জীবনে তারই দৃষ্টান্ত।”
বেগম রোকেয়ার শিক্ষা ও প্রেরণাকে ধারণ করেই প্রতিবছর ‘অদম্য নারী’ নির্বাচন করা হয়। এই সম্মান নির্বাচন করা হয় তাদেরই—যারা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং সমাজের পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
নাটোরে এই স্বীকৃতি পাওয়ায় জেলার নারী সংগঠনগুলো, উন্নয়নকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই শামীমা লাইজুকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সমাজের প্রান্তিক নারীদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের জীবনে আলো ছড়ানো এবং সংকট জয় করে এগিয়ে চলার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নারী হলেন শামীমা লাইজু নীলা।
তার অর্জিত ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা শুধুই ব্যক্তিগত নয়—এটি পুরো নাটোর জেলার নারীর অগ্রযাত্রার প্রতীক, একটি আলোকবর্তিকা।
মন্তব্য