নাটোরের গুরুদাসপুরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিন ফসলি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে গুরুদাসপুর পৌর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পৌর সদরের তাড়াশিয়াপাড়া বিলে পুকুর খনন করছেন ওই বিএনপি নেতা। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে চলছে এই খননকাজ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌর সদরের তাড়াশিয়াপাড়ার পাকা সড়কঘেঁষা ওই জমিতে বছরে তিনটি ফসল চাষ হয়। সপ্তাহখানেক আগে প্রকাশ্যে ওই জমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি শুরু করেন মিজানুর রহমান। সে সময় খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে খননকাজ বন্ধ করে দেয়। তবে কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাত থেকে আবারও মাটি কাটা শুরু হয়েছে। দিনের আলো ফোটার আগেই খননকাজে ব্যবহৃত এস্কেভেটর ও মাটি বহনের ট্রাক্টর সরিয়ে ফেলা হয়।
রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ১০ বিঘা জমির চারপাশ মাটি দিয়ে উঁচু করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। দক্ষিণ পাশে সদ্য খনন করা মাটির স্তূপ পড়ে আছে পাকা সড়কের ওপর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান ও তার লোকজন প্রভাব খাটিয়ে রাতভর পুকুর খনন করছেন। ভেকু আর ট্রাক্টরের বিকট শব্দে রাতে ঘুমানো দায় হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলায় ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। এসব জমিতে অবৈধভাবে তৈরী করা হয়েছে অসংখ্য পুকুর। ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টিসহ নানা পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় একটি পুকুর লিজ নিয়ে আমি মাছ চাষ করি। পুকুরটি সংস্কারের জন্য পাশ নেওয়া আছে। তবে সেটির এখনো কাজ শুরু করতে পারিনি। পুকুর খনেনের সাথে আমি জড়িত না। আমি এমপি সাহেবকেও বলেছি, আমার নামে এসব কালি মাখা হচ্ছে। তবে, এবিষয়ে জানতে তিনি উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেনের সাথে কথা বলতে বলেন।
পুকুর খননের বিষয়টি স্বীকার করে গুরুদাসপুর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন,
কাজ শুরুর একদিন পরই বন্ধ হয়ে যায়। আজকেও কাজ বন্ধ আছ, এখনো শুরু করতে পারিনি। কাজ শুরু করা যায়কিনা রাতে গিয়ে তা পর্যালোচনা করবেন বলে জানান তিনি।
মিজানুর রহমানের পুকুর ছাড়াও আরও দুটি পুকুর খনন করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আরও দুটি পুকুরের কাজও শুরু করতে পারিনি। ইট ভাটার জন্য প্রচুর মাটি লাগে। মাটি ছাড়া তো ইট হবে না। দেশের কোনো উন্নয়ন কাজও হবে না। যে জমিতে পুকুর খনন হচ্ছে সেদি ৩ বিঘা বলে জানান মোশাররফ হোসেন।
এদিকে, দলের নাম ভাঙিয়ে ফসলি জমিতে পুকুর খননের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ। তিনি বলেন, একটি অসাধু গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত হয় এবং ফসলি জমিতে পুকুর খনন করে। এ ধরনের অপকর্ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে প্রশাসনকেও কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। শুধু ব্যাটারি জব্দ করলেই হবে না, বরং মাটি খননের কাজে ব্যবহৃত এস্কেভেটর ও ট্রাক্টরও আটক করতে হবে। পাশাপাশি, এসব কর্মকাণ্ডে দলের কোনো নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, কোনোভাবেই ফসলি জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই। কয়েক দিন আগেই আমি নিজে গিয়ে তাড়াশিয়াপাড়া বিলের ওই খননকাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পুনরায় কাজ শুরু হওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য