নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর সরকারি কলেজের এক ছাত্রীর এইচএসসি পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অমিত কুমার সরকার নামে ওই কলেজের এক অফিস সহকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
শনিবার (৪ জুলাই) বেলা ১২টার দিকে লালপুর থানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ ইফতে খায়ের আলম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে লালপুর থানায় একটি মামলা রজু করা হয়েছে।
এদিকে গত ২ ও ৩ জুলাই দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে “ফরম পূরণের টাকা আত্মসাৎ, পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি নাটোরের ৮ শিক্ষার্থী” এবং “অফিস সহকারীর গাফিলতিতে এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে পারল না ৮ শিক্ষার্থী” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং তা শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নজরে আসে। মন্ত্রীর তাৎক্ষণিক ও জরুরি হস্তক্ষেপে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড বিশেষ ব্যবস্থায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ফর্ম পূরণ ও প্রবেশপত্র প্রস্তুত সম্পন্ন করায় আজ শনিবার থেকেই তারা নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
অভিযোগ ও প্রেস রিলিজ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ মার্চ সকালে ইসরাত জাহান সূচি এইচএসসি পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপের জন্য তিন হাজার পাঁচশত টাকা নিয়ে কলেজের অফিস কক্ষের সামনে যান। সেখানে কলেজের অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকারের সাথে তার দেখা হয়। অমিত কুমার সরকার সূচিকে অফিসে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সূচি ফর্ম ফিলাপের কথা জানায়। তখন অভিযুক্ত অমিত কুমার সরকার তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন যে, টাকা, ছবি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে জমা দিলে তিনিই ফর্ম ফিলাপ সম্পন্ন করে দেবেন। সরল বিশ্বাসে সূচি ফর্ম ফিলাপের টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অমিতের কাছে জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ফর্ম ফিলাপের বিষয়ে খোঁজ নিতে চাইলে অমিত কুমার সরকার সময়মতো কাজ হয়ে যাবে বলে আশ্বস্ত করতে থাকেন।
ঘটনার মোড় ঘোরে গত ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে, যখন কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র বিতরণ শুরু হয়। সূচি কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে অভিযুক্ত অমিত কুমার সরকার সূচির মায়ের মোবাইল নম্বরে ফোন করে জানান যে, প্রিন্সিপাল স্যার প্রবেশপত্র নেওয়ার জন্য রাজশাহীতে আছেন, তাই তাকে পরের দিন কলেজে আসতে বলা হয়।
পরদিন ৩০ জুন সকালে সূচি এবং তার বাবা কলেজে গেলে অমিত কুমার সরকার তাদের জানান যে, প্রবেশপত্রে কিছু সমস্যা থাকার কারণে তা সংশোধনের জন্য রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছে এবং সংশোধন শেষে তা প্রদান করা হবে। এরপর ১ জুলাই সকালে অমিত পুনরায় সূচির মায়ের মোবাইলের নম্বরে ফোন করে জানান যে, প্রবেশপত্রের সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি নিজেই রাজশাহী যাচ্ছেন।
অফিস সহকারীর এমন দফায় দফায় অসংলগ্ন কথাবার্তায় সূচির বাবার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তিনি কালবিলম্ব না করে ওই দিনই (১ জুলাই) সকালে মেয়েকে সাথে নিয়ে আব্দুলপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের (প্রিন্সিপাল) দ্বারস্থ হন। অধ্যক্ষ কম্পিউটারে ডাটাবেজ যাচাই করে জানান যে, ইসরাত জাহান সূচির ফর্ম ফিলাপ আদৌ করা হয়নি।
এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অভিযুক্ত অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকার সূচির নিকট থেকে ফর্ম ফিলাপের টাকা গ্রহণ করলেও তা বোর্ডে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং প্রবেশপত্র দেওয়ার নাম করে এতদিন মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, সূচি ছাড়াও কলেজের আরও ৭ জন শিক্ষার্থী একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। টাকা জমা দিলেও প্রবেশপত্র না পাওয়ায় গত ২ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রথম দিনের বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষায় তারা অংশ নিতে পারেননি।
বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্রুত রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিশ্চিতের নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি নাটোরের পুলিশ সুপার ও লালপুর থানার ওসির সাথে টেলিফোনে কথা বলে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। মন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত অমিত কুমার সরকারকে গ্রেফতার করে।
আজ শনিবার দুপুরে লালপুর থানায় অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ইফতে খায়ের আলম জানান, ছাত্রীদের শিক্ষাজীবন নিয়ে এমন জঘন্য প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জেলা পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেছে। অভিযুক্ত অমিত কুমার সরকারকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে লালপুর থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া ঘটনাটি তদন্তের জন্য আব্দুলপুর সরকারি কলেজের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্তব্য