ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিকতার ধর্ম নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, সংস্কার ও মানবকল্যাণের এক সামগ্রিক দর্শন। একটি সুন্দর বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমাজ বিনির্মাণে ইসলামী দার্শনিক ও আলেমদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সহ বিভিন্ন ইসলামী দার্শনিকরা সমাজ সংস্কার, শিক্ষা বিস্তার, নৈতিক উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
বাংলাদেশের আলেমরা সবসময় সমাজ সংস্কারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯শ ও ২০শ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় তারা মাদক, সুদ, সামাজিক বৈষম্য, নারী অবমাননা ও শিক্ষার পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। মাওলানা আছাদ আলী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী প্রমুখ আলেমরা মুসলিম সমাজে আধুনিক চিন্তাধারা প্রবর্তনে কাজ করেন।
আলেমগন বৈদেশিক উপনিবেশ, দিল্লীর দাসত্ব থেকে বাংলার মানুষকে মুক্তি দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহপাকে মুখাপেক্ষী করে বাংলার প্রতিটা মানুষকে আত্ননির্ভর এবং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চেয়েছেন। যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি, অপরাধমুক্ত সরকারী দপ্তর এবং স্বচ্ছ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো থাকবে। যেখানে চেতনা বিক্রয়ের নামে জনগনকে ধোকা দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে জনগনের টাকা দেশের বাইরে পাচার হবে না। যেখানে ৭১ এর চেতনা পড়াতে গিয়ে গানিতীক, দার্শনিক, অর্থনৈতিক, ভৌগলিক, সহ সকল পাঠ্যক্রম তুলে দিয়ে জাতীকে মেধাশুন্য বানিয়ে অজ্ঞতার দাসত্ব বরন করতে হবে না।
কিন্তু গত ১৭ বছরে বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা গেছে। ভাষা, বিজ্ঞান ও মেডিকেল সায়েন্স থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ প্রায় সন্ত্রাস, মাদক, যৌন অবাধ্যতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশের সন্তানরা তাদের সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং নৈতিক শক্তি হারিয়েছে, যা বাংলাদেশকে শতবর্ষের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে। মাওলানা কারামত আলী জাউরী, মাওলানা আব্দুল লতিফ এর মত একজন আল্লাহর বান্দা যিনি তার মালিক ছাড়া কাউকে ভয় করতেন না, তিনি ছিলেন আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। ফ্যাসিষ্ট আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক রাজনীতির নামে ছাত্র ছাত্রীদের মাদকতা, যৌনতা এবং অনাচারের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে দীর্ঘ সময় থেকে সমাজ সংকারক হিসেবে কাজ করতেন। তার সম্মোহনী কন্ঠে মানুষের অন্তচক্ষু খুলে দিতেন। ভালো মন্দের পার্থক্যের হিসাব সাথে সাথে করে একটি সুন্দর বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমাজ বিনির্মাণে কাজ করেছেন নীরলস ভাবে।
আজকের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ফ্যাসিষ্ট রাজনৈতিক রাজনীতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং মানুষের মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। ভাষা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানকে প্যারালাইজড করার মাধ্যমে জাতিকে মেধাশূন্য এবং অনৈতিকতার কবলে ফেলা হচ্ছে। জনগণের চেতনাকে বিকৃত করে, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। ইসলামী আলেমরা ঠিক এ ধরনের অরাজকতা ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সর্বদা সতর্ক থেকেছেন এবং সমাজ সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইসলামী দার্শনিকরা সমকালীন সমাজের অমঙ্গল যেমন দুর্নীতি, মাদক, নারী অবমাননা, শিক্ষার পশ্চাৎপদতা এর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে একটি নৈতিক ও সচেতন সমাজের জন্য শুধু আধ্যাত্মিকতা যথেষ্ট নয়; শিক্ষা, ন্যায়, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী দর্শন অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা, প্রশাসনে ন্যায়বিচার এবং শিক্ষার প্রসারের ওপর জোর দেয়।
ইসলামী দর্শন কেবল ধর্মীয় আদর্শ শিক্ষা দেয় না, নৈতিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে। আল-ফারাবি ইসলামী দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং রাষ্ট্রতত্ত্ব ও যুক্তি ক্ষেত্রে তার অবদান অনেক বেশী। তার মতে একটি সুশৃঙ্খল ও নৈতিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শাসককে কেবল ক্ষমতাধর নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক, নৈতিক ও শিক্ষিত হতে হবে। তিনি আরিস্টটলীয় দর্শনকে ইসলামী প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে। এর ব্যবহার ইসলামিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যায়, তাদের অবকাঠামো তৃনমূল থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই লক্ষ্যেই কাজ করে। আল-ফারাবির দর্শনে নৈতিক ও শিক্ষিত নেতৃত্ব সমাজকে পুনর্গঠন করতে পারে।
সমাজ সংস্কার, শিক্ষা প্রসার এবং নৈতিক উন্নয়নের জন্য এক অনুপ্রেরনার গল্প। তাদের আত্নত্যাগ আমাদের বারবার অরাজকতা থেকে মুক্তি দিয়েছে।
মন্তব্য