উত্তরাঞ্চলের ব্যস্ততম বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চলাচলে মুখর থাকে। কিন্তু মাত্র ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের ২৫টি বাঁক হয়ে উঠেছে মৃত্যুকূপ। বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং প্রবণতা ও তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে প্রাণ।
দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পরিবার
বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও গুরুদাসপুর ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মহাসড়কটিতে ঘটেছে ১১৪টি দুর্ঘটনা। প্রাণ গেছে ৩৪ জনের, আহত হয়েছেন অন্তত ১২৪ জন। প্রতিটি দুর্ঘটনায় ভেঙে গেছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন।
রেজুর মোড়ের ভয়াল স্মৃতি
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে ঘটে দেশের অন্যতম ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। ওভারটেকিং করতে গিয়ে একসঙ্গে ঝরে যায় ৩৮টি প্রাণ, আহত হন অন্তত ২৫ জন। আজও সেখানে গেলে স্বজনহারা মানুষের কান্না ভেসে আসে— “ওই দিন আমার বাবাকে হারাইছি”, “আমার স্বামী আর ফেরেনি”।
বাঁকের ফাঁদে মৃত্যুর মিছিল
কাছিকাটা ১০ নম্বর সেতু থেকে বনপাড়া বাইপাস চত্বর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে ১৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁক।
রাজাপুর থেকে আহম্মেদপুর পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটারে রয়েছে আরও ১০টি বাঁক।
সড়ক বিভাগের সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড রয়েছে মাত্র ১৫টিতে, যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
ঝুঁকির কারণ
প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সরু মহাসড়ক।
ভারী যানবাহনের দাপুটে চলাচল।
ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং।
তিন চাকার যানবাহনের অবাধ চলাচল।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির ঘাটতি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রবিউল করিম বলেন, “মহাসড়কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তিন চাকার যানবাহন। সার্ভিস লেন বাদ দিয়ে মূল সড়কেই ছুটে চলে অটোরিকশা-ইজিবাইক।”
রেজুর মোড়ের হাফিজুল ইসলামের মতে, “সড়ক প্রশস্ত করা ও তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ না করলে এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হবে না।”
দুর্ঘটনায় পঙ্গুদের আর্তনাদ
২০১৪ সালের দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, “পা ও পিঠ চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ঋণ করে চিকিৎসা করিয়েছি, এখন আর সম্ভব না। চাই, মহাসড়কটি নিরাপদ হোক যেন আর কেউ আমার মতো পঙ্গু না হয়।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হাইওয়ে থানার ওসি ইসমাইল হোসেন দাবি করেন, “তিন চাকার যানবাহনের দাপটের অভিযোগ সঠিক নয়। হাইওয়ে পুলিশ সবসময় গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।”
বনপাড়া ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, “বেপরোয়া গতি ও বাঁকে ওভারটেকিংয়ের কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিজেদের অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় না।”
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, “বনপাড়া-হাটিকুমরুল দেশের প্রথম সার্ভিস লেনযুক্ত মহাসড়ক। এখন চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে মহাসড়ক অনেকটাই নিরাপদ হবে।”
তাইজুল ইসলামের উদ্বেগ
জাতীয় ক্রিকেট দলের তারকা খেলোয়াড় তাইজুল ইসলামও মহাসড়কের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “সিরাজগঞ্জ রোড থেকে নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা হয়। চার লেন ও মাঝখানে বিভাজক থাকলে দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে।”
সংক্ষেপে বলা যায়, নাটোরের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। সরকারের পরিকল্পিত চার লেন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে প্রতিদিনই এ সড়ক থেকে নতুন নতুন পরিবারের স্বপ্ন ঝরে পড়বে।
মন্তব্য