রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার নলপুকুরিয়া গ্রাম। প্রায় আড়াই কিলোমিটার কাদায় ভরা রাস্তায় হেঁটেই স্কুলে যেতেন এখানকার শিক্ষার্থীরা। হাতে জুতা, পিঠে ব্যাগ, পায়ের নিচে কাদা—এভাবেই বড় হয়েছেন তারা।
এই ভাঙাচোরা রাস্তা পেরিয়ে পড়াশোনা করেই আজ অনেকেই হয়েছেন দেশের গর্ব। এবারের ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে দেশসেরা হয়েছেন শামীম শাহরিয়ার। একই গ্রামে জন্ম নেওয়া মাহাবুল হক বাবলু হয়েছেন জজ, সাব্বির হোসেন সুমন হয়েছেন সরকারি উকিল (এপিপি)। হাফিজুর রহমান এখন সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এছাড়াও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বহু সরকারি কর্মকর্তা এই গ্রামের সন্তান।
কিন্তু গ্রামবাসীর উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা সেই পুরনো সমস্যাই—রাস্তা। প্রায় ৫–৭ হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। নেই কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাই পড়তে গেলে বা চিকিৎসা নিতে হলে বাধ্য হয়ে ওই কাদামাখা রাস্তাই ব্যবহার করতে হয়। বৃষ্টি হলে রাস্তা কাদা-পানিতে অচল হয়ে পড়ে। কৃষকেরা মাঠ থেকে ফসল তুলতে পারেন না, বাজারে নিতে পারেন না। রোগী বা গর্ভবতী মায়েদের বহন করা যেন দুঃস্বপ্ন।
পররাষ্ট্র ক্যাডার শামীম শাহরিয়ারের কৃষক পিতা হাতেম আলী বলেন—
“আমার ছেলে বর্ষায় কাদামাটি পেরিয়ে স্কুলে যেত। আজও ছোট ছোট বাচ্চারা কষ্ট করে স্কুলে যায়। অসুস্থ রোগী বা গর্ভবতী মাকে মাথায় করে বহন করতে হয়। কোনো যানবাহন এই রাস্তা দিয়ে চলতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব এই রাস্তা সংস্কার করতে হবে।”
স্থানীয় শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন—
“স্বাধীনতার পর অনেক এমপি-মন্ত্রী এলেও রাস্তার উন্নয়ন হয়নি। এই রাস্তাই এলাকার উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়।”
একই গ্রামের সহকারী শিক্ষা অফিসার হাফিজুর রহমান বলেন—
“বৃষ্টি হলে দুই-তিন দিন বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। পড়াশোনার মূল ধারায় ব্যাঘাত ঘটে। আমার মেয়ে প্রায় প্রতিদিন জামা-কাপড়ে কাদা মেখে বাসায় ফেরে। আমার মনে হয় পৃথিবীর কোথাও এত খারাপ রাস্তা নেই।”
৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারিহা রহমান জানায় তার স্বপ্ন—
“আমি ডিসি হবো। কিন্তু এই রাস্তায় সাইকেল বা মোটরসাইকেল চলে না। স্কুলে যেতেই অনেক কষ্ট হয়।”
এদিকে উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান জানিয়েছেন, রাস্তার ব্যয় নির্ধারণ করে জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অচিরেই কাজ শুরু হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম নুর হোসেন নির্ঝর ও রাজশাহী এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামও দ্রুত সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন।
মন্তব্য