নাটোরের চলনবিল অঞ্চলের কৃষকরা এখন রসুনকে বলেন ‘সাদা সোনা’। কাদায় রোপিত এ রসুন শুধু কৃষকের ভাগ্যই বদলাচ্ছে না, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। অতুলনীয় স্বাদ, ঝাঁজ আর দীর্ঘদিন সংরক্ষণের গুণাবলি এ রসুনকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। তাই কৃষক ও স্থানীয়দের দাবি— এই রসুনের জন্য এখনই জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হোক।
শতবর্ষের ঐতিহ্য, ভিন্ন চাষপদ্ধতি
চলনবিলের শতবর্ষী কৃষকরা জানান, একসময় হালচাষ, সার-কীটনাশক ব্যবহার করে রসুন আবাদ হতো। কিন্তু খরচ বেশি ও ফলন কম হওয়ায় কৃষকরা সমস্যায় পড়তেন। পরবর্তীতে বানের পানি নামার পর কাদার ওপর সরাসরি রসুন রোপনের ধারা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে সেচ, সার বা কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। ধানের খড় বা কচুড়িপানা দিয়ে রোপিত কোয়া ঢেকে দেওয়ার ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ফসল পুষ্টি পায়, আর ফলন হয় বাম্পার।
কৃষক ছুলাইমান মৃধা বলেন,
“কাদার ওপর রসুন রোপনের জন্য জমি আলাদাভাবে তৈরি করতে হয় না। পলি মাটি উর্বরতা বাড়ায়, খড় পচে গিয়ে জমিতে জৌব শক্তি যোগায়। ফলে কম খরচে ভালো ফলন মেলে।”
অর্থকরী ফসল, নাম পেয়েছে ‘সাদা সোনা’
বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল রসুন। প্রতি বিঘায় গড়ে ২২–২৫ মণ ফলন হয়, যার বাজারমূল্য লাখ টাকারও বেশি। একই সঙ্গে জমিতে তরমুজ ও বাঙ্গি সাথী ফসল হিসেবে চাষ করে কৃষকরা অতিরিক্ত আয় করছেন। এ কারণে রসুন এখন শুধু একটি মসলা নয়, কৃষকের জীবিকার অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
কৃষক মহররম আলী বলেন,
“আমাদের জীবনের অবলম্বন এখন এই রসুন। এটা সত্যিই সাদা সোনার মতো।”
জিআই স্বীকৃতির দাবি
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি দপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের মোট রসুন উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশই হয় নাটোর জেলায়। তবে বিনাহালের কাদায় উৎপাদিত রসুনের স্বাদ-গন্ধ ও গুণমান একেবারেই আলাদা। সাধারণ শুকানোর মাধ্যমে ৪ থেকে ৬ মাস সংরক্ষণ করা যায় এই রসুন, যা দেশের অন্য কোথাও সম্ভব হয় না।
স্থানীয় প্রবীণ কৃষক আছমত আলী বলেন,
“আমার বাবাও এই রসুন চাষ করতেন, আমি করেছি, এখন আমার সন্তানরাও করছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এ আবাদ চলছে।”
প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগ
নাটোর জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন জানান, কৃষক ও স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চলনবিলের রসুনকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এতে বিদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা মিলবে, উৎপাদনও আরও বাড়বে।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান বলেন,
“চলনবিলের মাটি ও আবহাওয়া রসুন চাষের জন্য অনন্য। এখানকার উৎপাদিত রসুন দেশের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় আলাদা। তাই এ রসুন অবশ্যই জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।”
অর্থনৈতিক সাফল্য, প্রাচীন ঐতিহ্য ও ব্যতিক্রমী চাষপদ্ধতির কারণে বিনাহালের কাদায় উৎপাদিত রসুন ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে পেয়েছে ‘সাদা সোনা’র খেতাব। এখন কৃষক ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা— সরকারিভাবে জিআই স্বীকৃতি পেলে এই ঐতিহ্যবাহী ফসল শুধু চলনবিল নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও আরও সমৃদ্ধ করবে।
মন্তব্য