ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে সোমবার রাতে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। প্রতারক সাবেক স্বামী সুজনের হাতে খুন হয়েছেন নাটোর বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুর নওপাড়া গ্রামের মেয়ে শ্যামলী খাতুন (২৫)। এ হত্যাকাণ্ডে অকালেই মাকে হারালো তার ছোট্ট মেয়ে জুঁই। বৃদ্ধা মা মঞ্জুয়ারা বেগম এখন শোকে স্তব্ধ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়েছেন।
‘ছোট্ট বয়সেই শ্যামলীর বাবার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়েছিল। একাই সংসার সামলাতো ও। চাকরি করে যে টাকা পাঠাতো, তাতেই আমার ও নাতনির ভরণপোষণ চলতো। কিন্তু লম্পট সুজন আমার মেয়েকে মেরে ফেলল। আমার জীবন তো শেষের পথে, কিন্তু জুঁইকে এখন কে দেখবে?’ – বুক ভেঙে কান্নায় ভেসে কথাগুলো বলছিলেন শ্যামলীর মা।
স্থানীয়রা জানান, শিক্ষাজীবনেই বাগমারার আব্দুল জলিলের সঙ্গে বিয়ে হয় শ্যামলীর। এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসারও ভালোই চলছিল। কিন্তু শোরুমে চাকরি করার সময় পরিচয় হয় ম্যানেজার সুজনের সঙ্গে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে সুজন তাকে আগের সংসার ভাঙতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে ধর্মীয় মতে বিয়ে করলেও শ্যামলী জানতে পারেন—সুজনের রয়েছে আরেক স্ত্রী ও সন্তান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাকে ছেড়ে দেন।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি ভোগান্তি। গোপনে ধারণ করা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ব্যবহার করে শ্যামলীকে বারবার হুমকি দিতে থাকে সুজন। এমনকি নতুন স্বামীকেও ভিডিও পাঠিয়ে তার দ্বিতীয় সংসার ভেঙে দেয়। শেষ পর্যন্ত শ্যামলী ঢাকায় গিয়ে চাকরি নেন, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং মেয়েকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করেন।
৫ আগস্ট মাকে ও শিশুকন্যাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে আবারও চাকরির উদ্দেশ্যে ঢাকায় ফেরেন শ্যামলী। সোমবার রাতে সুজন কৌশলে তাকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ডেকে নেয়। ভাইরালের ভয় দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে সেখানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
বুধবার সকালে শ্যামলীর বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়—শিশু জুঁই একদম নির্বাক, মাকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। স্বজনরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে স্বাভাবিক করতে পারছেন না। চারদিকে শুধু কান্না আর শোকের আবহ।
শ্যামলীর চাচাতো ভাবি সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান চামেলী খাতুন বলেন—
“বছরখানেক আগে শ্যামলীর বাবা মারা গেছেন। ভাইও আলাদা সংসার করেন। শ্যামলীর উপার্জনেই চলত মা আর মেয়ে জুঁইয়ের জীবন। এখন জুঁইকে দেখার আর কেউ নেই। আমরা এ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
একজন মায়ের জীবনের সংগ্রাম এভাবে থেমে গেল কমলাপুর স্টেশনে। কিন্তু খোলা প্রশ্ন রয়ে গেল—শিশু জুঁইয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে? কে তার অভিভাবক হবে?
মন্তব্য