নাটোরে জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) শাহাদৎ হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারী শিশু পরিবারে (বালক) কর্মরত কারিগরি প্রশিক্ষক মোছাঃ মাকসুদা খাতুনকে যৌন হয়রানী, অশালীন কথাবার্তা বলা ও উত্যেক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনা তদন্তে পাবনা জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোঃ রাশেদুল কবীরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সোমবার (২৫ আগষ্ট) সরজমিনে বিষয়টি তদন্ত করবেন ওই কর্মকর্তা। নাটোর সরকারী শিশু পরিবারের উপতত্বাবধায়ক আরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শিশু পরিবারে কর্মরত কারিগরি প্রশিক্ষক মোছাঃ মাকসুদা খাতুন গত ৩ জুলাই জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেন।
ওই আবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি লিখিত ভাবেগত ৭ জুলাই জেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়। পরে সেখান থেকে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে জানানো হলে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য পাবনা জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ পরিচালককে (ডিডি) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ২৫ আগষ্ট (সোমবার) অভিযুক্ত ও অভিযোগকারীর উপস্থিতিতে সরজমিনে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে লিখিত অভিযোগ সুত্রে জানাযায়, শিশু পরিবারে কর্মরত কারিগরি প্রশিক্ষক মাকসুদা খাতুনকে মাঝে মধ্যেই দিনে-রাতে মোবাইল ফোনে অশালিন কথা বার্তাসহ ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এমনকি তার কর্মস্থলে গিয়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাকে ঘরে একা ডেকে কথা বলার চেষ্টা করেন। কথা বলার সময় ওই কর্মকর্তা নানা ভাবে যৌন হয়রানীমুলক এবং অনেক আপত্তিকর কথাবাতর্সিহ বাজে ইঙ্গিত দেন, উত্যেক্ত করেন।
যা অত্যন্ত আপত্তিকর এবং লজ্জাজনক। বিষয়টি নিয়ে তাকে বার বার সর্তক করাসহ নিষেধ করেন ওই নারী প্রশিক্ষক। কিন্তু তিনি তা কর্নপাত করেন। এজন্য প্রথমে বিষয়টি সহকর্মীদের অবহিত করেন ওই নারী। পরবর্তীতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়ে সরকারী শিশু পরিবারের উপ তত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন তিনি। যা বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
এ বিষয়ে নাটোর শিশু পরিবারে কর্মরত কারিগরি প্রশিক্ষক মোছাঃ মাকসুদা খাতুন বলেন, জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেন তার সাথে যে আচরণ করেছেন তার যথাযথ বিচার চান। যাতে আর কোন নারীকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। অভিযোগের বিষয়ে কারো প্ররোচনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজের ইচ্ছা আর মনোবল নিয়ে এই অভিযোগ করেছেন। কেউ তাকে প্ররোচনা দেন নাই, যা ঘটেছে তাই অভিযোগ করেছি।
অভিযুক্ত নাটোর জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেন এ অভিযাগ অস্বীকার করে বলেন, হেয়পন্ন করা সহ তাকে ফাঁসাতে পরিকল্পিত ভাবে এমন অভিযোগ করা হয়েছে। ওই নারীকে তিনি কখনও উত্যেক্ত বা যৌনহয়রানী করার অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, অফিসের অভ্যন্তরীন নানা অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবাদ করার কারনেই পরিকল্পিত ভাবে তার ক্ষতি বা সম্মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশপাশি এ অফিস থেকে তাকে বদলী করতে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। আর এসব কাজে তার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ইন্ধন রয়েছে। ইতিপুর্বে তারা বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোন সত্যতা পায়নি কেউ বলে দাবী করেন তিনি।
নাটোর জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমানিত হলে কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবেন। তবে আমার জানামতে জেলা সমাজ সেবা কার্যালয় থেকে এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ বা কারো ইন্ধন নেই। এটি তার মনগড়া কথা ছাড়া আর কিছু নয়।
তদন্ত কর্মকর্তা ও পাবনা জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) রাশেদুল কবীর বলেন, বিভাগীয় কার্যালয় থেকে তিনি এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। সমাজ সেবা রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক তাপস ফলিয়া এই তদন্তের নির্দেশ দেন। আজ ২৫ আগষ্ট (সোমবার) অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সমাজ সেবা নাটোর জেলা কার্যালয়ে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমানিত হলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজ সেবা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেনের বিরুদ্ধে শুধু নারী কেলেঙ্ককারীর ঘটনা নয়, তার বিরুদ্ধে অফিসের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলী, তদন্ত প্রতিবেদনসহ নানা অজুহাতে ঘুষ গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে। জেলা কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অনেকের কাছে ঘুষ বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টাকা না দিলে দাপ্তরিক নানা ঝামেলা করতেন তিনি।
আবার বিষয়টি জানাজানি হলে আদায়কৃত ঘুষের টাকা ফেরত দিয়েছেন এমনও নজির রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে কেউ ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাননি। তার কর্মকান্ডে অফিসের অনেকেই বিরক্ত। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেন আবারও বলেন, তাকে হয়রানী করতেই বিভিন্ন ভাবে এসব মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ বা ফেরতের অভিযোগ সঠিক নয়।
সংশ্লিষ্ট সুত্র আরো জানায়, সহকারী পরিচালক (এডি) মোঃ শাহাদৎ হোসেন জেলার গুরুদাসপুর উপজেলা সমাজ সেবা অফিসার থাকাকালীন সময়ে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল নাটোর শহরের ভবানীগঞ্জ এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে এক নারী সহকর্মীকে নিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। আটক ওই নারী সহকর্মী সেসময় জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের টেকনিক্যাল ইন্সট্রাক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সেসময় একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ওই কর্মকর্তা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় কর্মরত অবস্থায়ও নারী কেলেঙ্ককারীর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। পরে সেখান থেকে তাকে নাটোরের গুরুদাপুর উপজেলায় বদলী করা হয়।
এছাড়া সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় সমাজ সেবা অফিসার হিসাবে কর্মরতা থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে ৫ মে রোগী কল্যাণ তহবিলের অর্থ ৩৫ জন লোকের অনুকুলে বরাদ্দ দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করা, মহিলা কর্মচারীদের সাথে অশালীন ভাষায় কথা বলা, কর্মচারীদের গায়ে হাত তোলাসহ মুক্তিযোদ্ধা ও সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে খারাপ আচরণের অভিযোগ প্রমানিত হয়। সেসময় এসব ঘটনায় তৎকালীন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দেন।
সুত্র জানায়, সরকারী শিশু পরিবারে (বালক) কর্মরত কারিগরি প্রশিক্ষক মোছাঃ মাকসুদা খাতুন তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানী, অশালীন কথাবার্তা বলা ও উত্যেক্ত করার অভিযোগ দেয়ার পর তিনি ঢাকায় বদলির জন্য আবেদন করেছেন। তিনি নিজেকে থাইরয়েড ও প্রোস্টাটাইটিস রোগী দাবী করে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণের সুবিধার কথা উল্লেখ করে বদলীর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর গত ১১ আগষ্ট লিখিত আবেদন করেছেন। ওই আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, তিনি গত ২০২০ সালের ৫ জুলাই জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক (এডি) হিসাবে যোগদান করেন। বর্তমানে তার এই কর্মস্থলে চাকুরীর মেয়াদ ৫ বছর পুর্ণ হয়েছে।
নাটোর সরকারী শিশু পরিবারের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে যেহেতু অভিযোগ হয়েছে, সেটার তদন্ত হবে। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, একজন সরকারী কর্মকর্তার এমন অনৈতিক কর্মকান্ড কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব ঘটনার সুবিচার হওয়া উচিত। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
মন্তব্য